ঠিক ক’টি মিথ্যাকথা বলেছিলেন ‘সত্যবাদী’ যুধিষ্ঠির?

‘মহাভারত’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র যুধিষ্ঠিরের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল সত্যবাদিতা। তিনি ধর্মপুত্র। অনৃতভাষণ তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। মহাভারত-এর পাঠকমাত্রেই জানেন, যুধিষ্ঠিরের মতো সত্যবাদীরও কিছু স্খলন রয়েছে। এবং সেই স্খলনের কারণে তাঁকেও একবার নরকদর্শন করতে হয়েছিল। সেই স্খলনটি একটি মিথ্যাভাষণ।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের এক বিশেষ মুহূর্তে একথা অনুভূত হয় যে, দ্রোণাচার্যের পতন না ঘটলে পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধে জয়লাভ সমীচীন হয়ে উঠছে। পাণ্ডবপক্ষীয়রা জানতেন অস্ত্রগুরু দ্রোণ দুর্দমনীয়। তাঁকে বধ করার জন্য পাণ্ডবদের ছলনার আশ্রয় নিতে হয়। কৃষ্ণের প্ররোচনায় দ্রোণকে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যুসংবাদ শোনানো হয়। বাস্তবে নিহত হয়েছেল অশ্বত্থামা নামের একটি হাতি। দ্রোণ জানান, তিনি এই সংবাদ বিশ্বাস করেন না। একমাত্র যুধিষ্ঠির যদি বলেন তাহলে তিনি তাঁর পুত্রের মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করবেন। যুধিষ্ঠীর দ্রোণকে উচ্চৈস্বরে জানান, ‘অশ্বত্থামা হত’। কিন্তু নিজের সত্যবাদিতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য খুবই মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেন— ‘ইতি গজ’। বিমূঢ় দ্রোণ অস্ত্রত্যাগ করলে তাঁকে হত্যা করা হয়। এবং সদা সত্যবাদী যুধিষ্ঠীরের চরিত্রে ‘অর্ধসত্য’ কথনের কলঙ্ক এসে লাগে। আর এই কারণেই তাঁকে একবারের জন্য নরকদর্শন করতে হয়।

এখন প্রশ্ন হল, গোটা মহাভারত-এ কি যুধিষ্ঠীরের অনৃতভাষণ এই একবারই। নাকি আরও উদাহরণ রয়েছে ধর্মপুত্রের মিথ্যাভাষের?

খুঁটিয়ে মাহাকাব্যটি পড়তে গেলেই চোখে পড়ে, একাধিক মিথ্যাই যুধিষ্ঠীরের কণ্ঠ থেকে নির্গত হয়েছিল। কিন্তু সেগুলিকে কোনও রহস্যময় কারণে ‘মিথ্যা’ বলে ধরা হয় না। সেই মিথ্যাগুলিকে জানতে হলে প্রবেশ করতে হবে মহাভারত-এর অজ্ঞাতবাস পর্বে। বারো বছরের বনবাস শেষ হলে পাশাখেলার চুক্তি অনুযায়ী একবছরের অজ্ঞাতবাস পালন করার কথা পাণ্ডবদের। তাঁরা বিরাট রাজার শাসনাধীন মৎস্য রাজ্যে সেই পর্বটি কাটাবেন স্থির করেন। এই অজ্ঞাতবাসের কারণেই যুধিষ্ঠীরকে পর পর অনেকগুলি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়।


প্রথমত, তিনি নিজের পরিচয় গোপন করেন এবং মিথ্যা পরিচয় দেন। তিনি রাজা বিরাটকে বলেন যে, তাঁর নাম কঙ্ক। তিনি ব্রাহ্মণসন্তান। এবং তিনি পাশাখেলায় দক্ষ। রাজা তাঁকে সভায় স্থান দেন। তার পরে যুধিষ্ঠীর তাকে একে একে তাঁর ভাইদের পরিচয় দেন। বলাই বাহুল্য, সবক’টিই মিথ্যা পরিচয়। শাপগ্রস্ত অর্জুনকে বৃহন্নলা সাজতে হয়। যুধিষ্ঠীরের সম্মতি ছাড়া তা সম্ভব ছিল না। দ্রৌপদীর পরিচয়েও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। তাঁর নাম রাখা হয় সৈরিন্ধ্রী। এবং যুধিষ্ঠীর কখনওই জানাননি যে তাঁর সঙ্গী বাকি চারজন তাঁর সহোদর এবং দ্রৌপদী তাঁদের স্ত্রী। এখানেও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়।

সেই হিসেবে দেখলে ১৫টি অনৃতভাষ ধর্মপুত্রের মুখ থেকে নির্গত হয়েছিল।